আমরা বেশিরভাগ মানুষ এই হাইড্রোনেফ্রোসিস শব্দটির সাথে পরিচিত নই। তাই আজকে আমি আপনাদের সাথে হাইড্রোনেফ্রোসিস নিয়ে আলোচনা করবো এবং কি কি কারনে এই রোগটি দেখা দেয় এবং এর চিকিৎসা কি সেই বিষয়েও আলোচনা করবো।
প্রথমেই জেনে নেই হাইড্রোনেফ্রোসিস কি? হাইড্রোনেফ্রোসিসকে সহজ ভাষায় বলতে গেলে বুঝানো হয় কিডনিতে পানি জমা বা কিডনি ফুলে যাওয়া। অর্থাৎ কিডনির মুখ এবং কিডনির নল দুটো যেখানে সংযুক্ত হচ্ছে সেই জায়গাটি চিকন বা সরু হয়ে যাওয়া। যার ফলে কিডনি থেকে প্রস্রাব বের হতে পারে না এবং সেই প্রস্রাব কিডনিতে আটকে গিয়ে কিডনি ফুলে যায়। যাকে মেডিকেল ভাষায় বলা হয় হাইড্রোনেফ্রোসিস।
হাইড্রো অর্থ পানি এবং নেফ্রোসিস অর্থ কিডনির ভিতরে পানি আটকে যাওয়া। কিডনির কাজ হলো আমাদের দেহকে বর্জ্য মুক্ত রাখা। অর্থাৎ কিডনি একটি ছাঁকনি যন্ত্র। যা আমাদের দেহের বর্জ্য পদার্থ ছেঁকে বিশুদ্ধ অংশ রক্তস্রোতে ফেরত দিয়ে অবশিষ্ট বর্জ্য পদার্থ প্রস্রাব আকারে বের করে দেয়। কিন্তু যখন এই বর্জ্য পদার্থ অর্থাৎ প্রস্রাব বের হতে পারবে না তখনই কিডনি ফুলে যাবে বা পানি জমে যাবে। যা পরবর্তীতে ডায়াগনোসিস হবে হাইড্রোনেফ্রোসিস হিসেবে।
হাইড্রোনেফ্রোসিস দুই ধরনের হতে পারে :
১. Bilateral Hydronephrosis অর্থাৎ দুটি কিডনিতে একসাথে পানি জমা।
২. Single Hydronephrosis অর্থাৎ যেকোনো একটি কিডনিতে পানি জমা।
কারণ
১. কিডনির মুখ ও কিডনি নালী দুটির সংযোগের জায়গা সরু বা চিকন হয়ে যাওয়া।
২. কিডনি নালীতে যেকোনো ব্লকেজ বা বাধা সৃষ্টি হওয়া। এই বাধা অনেক কারনে হতে পারে। যেমন : কিডনিতে পাথর, রক্ত জমাট বাধা, টিউমার বা সিস্ট।
৩. পুরুষদের ক্ষেত্রে প্রস্টেট অতিরিক্ত বড় হয়ে যাওয়ার কারনে হাইড্রোনেফ্রোসিস হতে পারে। বিশেষ করে ৬০ বছরের পর পুরুষদের প্রস্টেট স্বাভাবিকের তুলনায় বড় হতে থাকে। তখন হাইড্রোনেফ্রোসিস দেখা দেওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
৪. এছাড়া মূত্রতন্ত্রে বা Urinary System – এ যদি কোনো ক্যান্সার হয় সেক্ষেত্রে ক্যান্সারাস টিউমার মূত্রনালীতে প্রেসার দিলে হাইড্রোনেফ্রোসিস হতে পারে।
লক্ষণ
< কিডনির দুই পাশেই মৃদু ব্যাথা।
< যে পরিমাণ পানি খাওয়া হচ্ছে সে পরিমাণ প্রস্রাব না হওয়া।
< প্রস্রাব ঘোলাটে বা লালচে হওয়া।
< ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ আসা।
< মূত্রনালির ব্যাকটেরিয়াঘটিত সংক্রমণ (UTI)
< জ্বর
< ক্ষুধা কমে যাওয়া
< বমি বমি ভাব
< বমি হওয়া
হাইড্রোনেফ্রোসিস সনাক্তকরণ : হাইড্রোনেফ্রোসিস সনাক্তের জন্য আল্ট্রাসাউন্ড সবথেকে উপযোগী মাধ্যম। তবে সিটি স্ক্যান বা MRI এর মাধ্যমেও এটি সনাক্তকরণ করা হয়।
চিকিৎসা
হাইড্রোনেফ্রোসিসের চিকিৎসা মূলত দুই ধরনের।
১. Medical Treatment
২. Surgical Treatment
হাইড্রোনেফ্রোসিস চিকিৎসার জন্য প্রথমেই যা জানা উচিৎ তা হলো কি কারণে রোগটি হয়েছে। কারণটি নির্ধারণ করতে পারলে চিকিৎসা করতে সুবিধা হয়। যদি কিডনি পাথরের জন্য হাইড্রোনেফ্রোসিস হয়ে থাকে তাহলে সেটি প্রথমে মেডিসিনের মাধ্যমে ভালো করার চেষ্টা করতে হবে। Medical চিকিৎসার ক্ষেত্রে সর্বপ্রথম করণীয় হলো রোগীর ব্যাথা নিয়ন্ত্রণ করা এবং ইনফেকশন দূর করা অ্যান্টিবায়োটিকের মাধ্যমে। কিডনির যেকোনো ব্লকেজ যদি ঔষধের মাধ্যমে ভালো না হয় তাহলে সেটা অপারেশনের মাধ্যমে নিরাময় করতে হবে। যেমন: কিডনিতে পাথর, টিউমার, সিস্ট বা রক্ত জমাট বেঁধে মূত্রনালীতে বাধা সৃষ্টি।
ডায়েট প্ল্যান :
রক্তে ইউরিক এসিডের পরিমাণ বেড়ে গেলে কিডনিতে পাথর হয় এবং কিডনি একেবারে কাজ করা বন্ধ করে দেয়। তাই যাদের কিডনিতে সমস্যা তাদের কিছু সব্জি একেবারে বাদ দিতে হবে। যেমন – পালংশাক, টমেটো, ঢেড়স, ব্রোকোলি এবং ফুলকপি, মাশরুম, শালগম, গাজর, কচুশাক, মূলা, পুইশাক, এবং গরুর মাংস, খাসির মাংস। এগুলো ডায়েট থেকে একেবারে বাদ দিতে হবে। কারণ এগুলোতে পিউরিন বেশি থাকে। যা মেটাবলিজম হয়ে রক্তে ইউরিক এসিড তৈরি করে। যা কিডনি একেবারে নষ্ট করে দেয়। তাই যাদের কিডনিতে সমস্যা তারা তো এগুলো খাবেনই না আর যাদের সমস্যা নেই তারাও একটু কম খাবেন।
হাইড্রোনেফ্রোসিস রোগীদের সোডিয়াম, পটাসিয়াম এবং ফসফরাস কম খেতে হবে। যেমন : – যেকোনো খাবারে লবণ কম খেতে হবে। – কলা, আনারস, আঙুর, কমলালেবু, আপেল, যেকোনো সবুজ শাক লিমিট রেখে খেতে হবে।
– বাইরের কোনো খাবার খাওয়া যাবে না।
– চিনিযুক্ত পানীয় বা ফলের রস খাওয়া যাবে না।
– অতিরিক্ত ফ্যাটযুক্ত দুধ, পনির, মাখন খাওয়া যাবে না।
– পানি খেতে হবে। তবে শরীরের ঘাম এবং প্রস্রাবের পরিমাণ দেখে পানি পান করতে হবে। কারণ অতিরিক্ত বেশি পানি বা অতিরিক্ত কম পানি পান করাও কিডনির জন্য ক্ষতিকর।
-প্রোটিন খেতে হবে। যেমন – মাছ, ডিম, মুরগির মাংস। তবে মুরগী বা গরু, খাসির কলিজা, লিভার, ঘিলু, পাকস্থলী এসব খাওয়া যাবে না। গরু এবং খাসির মাংস পুরোপুরি বাদ দিতে হবে।
আশা করি কিছুটা হলেও হাইড্রোনেফ্রোসিস সম্পর্কে ধারনা দিতে পেরেছি। এই সমস্যাটি নিয়ে কখনো অবহেলা করবেন না। কারণ দীর্ঘদিন কিডনিতে পানি জমে থাকলে কিডনি পুরোপুরি কাজ করা বন্ধ করে দেয়। তাই অল্প কিছু লক্ষন দেখা দিলেই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিবেন।